পথ ঘোরাও নিজের পথে

0
61

এই পৃথিবী নামক গ্রহটির দুই শতাধিক দেশে ৭৫০ কোটি মানুষের বাস। পশ্চিমের অর্থনৈতিকভাবে উন্নত দেশগুলো নানাভাবে দক্ষিণের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে। ভবিষ্যতেও হয়তো করবে। তবে মজার ব্যাপার হলো উত্তরের দেশগুলোকে নানাভাবে দক্ষিণের দেশগুলোর ওপর নির্ভর করতে হয়। নিজেদের প্রযুক্তি খাত ও ব্যবসা দুনিয়ার জোর বাড়াতে মেধা পাওয়ার জন্য হোক কিংবা তাদের অস্ত্র বিক্রির জন্য হলেও আফ্রিকা ও এশিয়ার দেশগুলোই ভরসা। প্রভাব-প্রতিপত্তির নামে উত্তরের দেশগুলো আমাদের ওপর ছড়ি ঘোরানোর চেষ্টা করে আসছে অনেক বছর ধরেই। আর কতকাল চলবে এই প্রতিপত্তির সমীরণ?

আমরাও কিন্তু চেষ্টা করছি উঠে দাঁড়ানোর। হিমালয় পর্বতের আশপাশের দেশ চীন আর ভারতের দিকে তাকালেই তো দেখি পশ্চিমের দেশগুলোতে আজ তাদের মেধাসম্পদের প্রভাব। ভারত আর চীনের প্রাচীন ইতিহাস তো এক নাড়িতেই পোঁতা। জ্ঞান-বিজ্ঞানের নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় তো ছিল এখানেই, আমাদের মুন্সিগঞ্জের অতীশ দীপঙ্কর এই তো হাজার বছর আগে চীনে বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লব এনেছিলেন। ইউরোপ আর আমেরিকার নামীদামি ৫০০ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে আজ ভারত-চীনের জয়জয়কার। আর আমরা! আমাদের পথে নামার সময় চলে যাচ্ছে কিন্তু!

অনেকেই মনে করেন, আরে বাংলাদেশে পড়ালেখা ঠিকমতো না হলে উত্তরের দেশগুলোর এত মাথাব্যথা হয় কেন? কেন তারা কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচ করতে চায় আমাদের পড়ালেখার জন্য? কেন আমাদের ছেলেমেয়েদের ওরা স্কলারশিপ দেয়? প্রতিবছর ৫ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী পড়তে যায় শুধু মার্কিন মুল্লুকে, আর নানা জায়গা মিলিয়ে প্রায় ৩০ হাজার। আমাদের মেধা ও বুদ্ধি তো ওদের কাজে লাগছে। শিকাগোর সুউচ্চ সিয়ার্স টাওয়ার থেকে শুরু করে বিগ ব্যাং গবেষণায় আমাদের হাত ও মাথার কাজ আছে।

এরই মধ্যে বিশ্বটা সেই নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে একটা বৈশ্বিক গ্রামে পরিণত হয়েছে। সেই গ্রামে এখন সবাই এক তারে গাঁথা! মনে আছে, গ্রামীণফোনের প্রতিষ্ঠাতা ইকবাল কাদিরের সেই বিখ্যাত বাণী: Connectivity is productivity (সংযুক্তিই উৎপাদনশীলতা)। সংযোগ এখন দ্বিমুখী ছুরি। এর এক ধার দরকার নিজের মান উন্নয়নে-কত কিছু আছে ইন্টারনেটে-বই, পড়া, নোট, হোমওয়ার্ক, ভিডিও কত-কী। অন্যদিকে এটি দেয় ভূরুঙ্গামারীতে থেকে নির্মল বাতাস খেয়ে নরওয়েতে চাকরি করার সুযোগ!

প্রতিদিন যখনই পিসিতে বসি, তখনই শুনতে পাই ইন্টারনেট আর জ্ঞানের জগৎ ডাক পাড়ে: আয় আয় আয় জ্ঞানের দুনিয়ায়। আয় আয় আয় কাজের দুনিয়ায়।

কত সুযোগ, কত উদ্যম, কত সম্ভাবনা। ৭৫০ কোটি লোক, ৭৫০ কোটি সম্ভাবনা।

কেবল তথ্যপ্রযুক্তি খাতের আউটসোর্সের বাজার ৬০ হাজার কোটি ডলারের বেশি, গত কয়েক বছরে রেমিট্যান্সের বাজার বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণ। ২০২০ সালে লাখ লাখ প্রোগ্রামারের সন্ধানে হন্যে হয়ে ঘুরবে উন্নত দেশগুলো। ২০২৩ সালে আমাদেরই তো বছরে ১ লাখ ম্যানেজার লাগবে। এসবের কারণে দেশগুলোতে বেড়েছে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ। গত ১০ বছরে এই বাংলাদেশেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বেড়েছে ৫০ শতাংশ।

কিন্তু কোথায় যেন তাল কেটে যাচ্ছে। দেশের ৪৭ শতাংশ গ্র্যাজুয়েট চাকরি পাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সংজ্ঞা অনুসারে দেশে বেকার ২৭ লাখের মতো। কিন্তু সাম্প্রতিক হিসাব বলছে পৌনে ৫ কোটি লোক আসলে কর্মহীন। তাদের সিংহভাগই তরুণ।

চাকরিদাতারা বলছেন, তারা যোগ্য নয়। তাঁরা চাকরির জন্য লোক খুঁজে আনছেন ভারত, শ্রীলঙ্কা, চীন, ফিলিপাইন থেকে। সেই লোকগুলো হাজার হাজার কোটি টাকা আমাদের দেশ থেকে নিয়ে যাচ্ছে। গত বছরই তো নিল প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ তো ভারতের তৃতীয় বড় রেমিট্যান্স প্রেরক দেশ। আর আমাদের যুবারা দরখাস্ত লিখছে, প্রতি বৃহস্পতিবার ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিচ্ছে নিয়োগ পরীক্ষা দেবে বলে। প্রতি মাসে গড়ে ২-৩টি সরকারি নিয়োগ পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পা পড়ছে তাদের। আর আবেদনের জন্য গড়ে প্রতি মাসে কয়েক হাজার টাকাও খরচ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আয় নেই।

এদের অনেকে চাইলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বছরগুলোকে আরও সুন্দর করে কাজে লাগাতে পারত, নিজেকে তৈরি করতে পারত নানা যোগ্যতা ও দক্ষতায়। কিন্তু তখন সময় হয়নি। কারণ ক্লাস শেষ না করেই চলে যেতে হয়েছে আড্ডায়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে গেছে ক্যানটিনে, লাইব্রেরিটা কোথায় সে খবর নেওয়া হয়নি, ইন্টারনেটে সময় কেটেছে কেবল ফেসবুকে।

ক্লাস হয় না বলে জীবন থেমে থাকবে, কেটে যাবে শুধু আড্ডায়?

প্রথম আলোর ‘তরুণেরা কী ভাবছে’ শীর্ষক জরিপ জানাচ্ছে, ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন ৮২ শতাংশ তরুণ। আর ৬৩ শতাংশ জানেই না জীবনের লক্ষ্য কী! নিরুত্তাপ, হতাশার আবর্তে মনে হয় ঘুরপাক খাচ্ছে। জানতে চাইলে বলে, আমাদের কথা কেউ ভাবে না। আমরা কোথায় যাব?

কোথায় যাব মানে কী? নিজের পথ নিজেকেই তৈরি করে নিতে হবে। বুয়েট কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে না পড়লেই তো জীবন ব্যর্থ নয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে জীবন অনেক বড়। কাজে হাল ছাড়া যাবে না। দেশের যে প্রান্তেই থাকো, নিজেকে গড়ে নিতে হবে, আগামীর জন্য। অন্যদের মতো সময় নষ্ট কোরো না। তাহলে কালের ডাক শুনতে পাবে না। পরে সেটা পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা। রাত জেগে মোটা মোটা কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স আর গাইড পড়ার চেষ্টা। সবাই কি পারে অসময়ের নয় ফোঁড়কে সময়ের এক ফোঁড়ে পরিণত করতে?

তোমরা যারা এখন বিশ্ববিদ্যালয় দাপিয়ে বেড়াচ্ছ, তোমরা কি শুনতে পাচ্ছ কালের ডাক? ডারউইনের সেই আপ্তবাক্য-যোগ্যরাই টিকে থাকে। শুনতে কি পাচ্ছ ৭৫০ কোটি মানুষের পৃথিবী তোমার দক্ষতা, যোগ্যতা ও ভালোবাসার জন্য অপেক্ষা করে আছে? নানান প্রান্তের মানুষ বসে আছে তোমার নেতৃত্বের জন্য, তোমার উদ্ভাবনের জন্য এবং তোমার ডাকের জন্য? কান পাতো, নিজের অন্তরের ডাক শোনো।

তোমাদের কাছে আমরা নিয়ে আসব এই বিশ্ববার্তা, হার না মানা তারুণ্যের ডাক। ক্রাউন সিমেন্ট-প্রথম আলো তারুণ্যের জয়োৎসবে আমাদের উদ্দেশ্য তরুণদের বিজয়ের রথে তুলে দেওয়ার ডাক দেওয়ার।

আমরা তাদের জানাতে চাই-ঝাঁপিয়ে পড়ো। বিশ্ব তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।

পথ ঘোরাও নিজের পথে।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here